গাঢ়বুক ছাতারের খোঁজে..

২০১৮ সালের ৬ মার্চ। হবিগঞ্জের সাতছড়ির জাতীয় উদ্যানের পুণ্যি পুকুরের পাশে বসে আছি। একে একে পাখিরা আসছে, গোসল করছে, চলে যাচ্ছে। ঠিক বিকেল চারটার সময় সাদা-কালো ডোরাকাটা মাথা ও গলার একটি পাখি আচমকা পানিতে নামল। সেদিনই ওকে প্রথম দেখি। দ্রুত ক্যামেরায় ক্লিক করলাম। কিন্তু পাখিটির ছটফটে স্বভাবের কারণে একটি ছবিও ভালো হলো না। পাখিটিও মুহূর্তেই ঝোপের আড়ালে হারিয়ে গেল। মিনিটখানেক পর আবারও সে এল। কিন্তু পাখিটির অতিরিক্ত চঞ্চলতার কারণে বেশির ভাগ ছবিই ঝাপসা হয়ে গেল। যে কটি ছবি ফোকাস হলো, পুকুরে পড়ে থাকা গাছের ডালপালার কারণে সেগুলোর একটিতেও পাখিটির মাথা ও চেহারা উঠল না। পরের কয়েক বছর আরও বেশ কবার পুণ্যি পুকুরে ওদের ছবি তুললাম। কিন্তু ফলাফল একই।
অবশেষে গত ২৬ মার্চ এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিরল ও দুর্লভ পাখির খোঁজে বার্ডিংবিডি ট্যুরসের সঙ্গে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হাজারিখিল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে এলাম। সকালের নাশতার আগে দুই ঘণ্টা বার্ডিং করে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বেশ কিছু ভালো ছবি তুললাম। নাশতার পর ছড়ার দিকে গিয়ে বিরল কাঠময়ূরের জন্য ক্যামোজালে নিজেদের ঘিরে ওর চলাচলের পথের নিরাপদ দূরত্বে ঘাপটি মেরে বসে রইলাম। কিন্তু প্রায় চার ঘণ্টা পার হলেও পাখিটির দেখা পেলাম না। বসে থাকতে থাকতে পা ঝিনঝিন করছে। তাই আমরা দু-তিনজন ওখান থেকে উঠে ছড়ার আরও ভেতরে চলে গেলাম। যদি অন্য কোনো পাখির দেখা পাই? 

ছড়ার পানিতে খানিকটা হাঁটার পর একটি বাঁশঝাড়ের কাছে আসতেই বেশ কিছু ছোট পাখি ঘোরাঘুরি করতে দেখলাম। চুপি চুপি ওদের পিছু নিলাম। জায়গাটা বেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন। তারপরও ছাড় দিলাম না। এবার একটি ভালো ছবি তুলতেই হবে। কিছুক্ষণ ধৈর্য ধরে ক্লিক করার পর অবশেষে অতি চঞ্চল পাখিগুলোর কিছু ভালো ছবি তুলতে পারলাম। পরদিনও প্রায় একই সময়ে ছড়ার আরও গহিনে আরেকটি স্থানে একই প্রজাতির পাখির আরও কিছু ছবি তুললাম।

সাতছড়ির পুণ্যি পুকুর ও হাজারিখিলের ছড়ায় দেখা এই পাখি এ দেশের এক আবাসিক পাখি, নাম গাঢ়বুক ছাতারে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বলে ধূসর-গলা ছাতারে। আবাস এলাকার কোথাও পাখিটি বিরল হলেও অন্য স্থানে দুর্লভ। ইংরেজি নাম গ্রে-থ্রটেড ব্যবলার। তিমালিইডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Stachyris Nigriceps। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই পাখিটির দেখা মেলে। এ ছাড়া চীনের কোনো কোনো অঞ্চলে পাখিটি বাস করে।

গাঢ়বুক ছাতারের দেহের দৈর্ঘ্য গড়ে ১২ সেন্টিমিটার। ওজন ১৫ গ্রাম। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। মাথার চাঁদি কালচে; চাঁদির ঠিক মাঝখানটায় সাদা লম্বা দাগ। চোখের বলয় সাদাটে। সাদাটে ভ্রুরেখাটি চোখ হয়ে ঘাড়ের পেছন পর্যন্ত চলে গেছে। চিবুক–গলায় কালো-সাদা-ধূসরের মিশ্রণ। দেহের ওপরটা জলপাই বাদামি। কান-ঢাকনি ও বুক হালকা লালচে-পীতাভ। বগল, পেট, তলপেট ও লেজতল জলপাই রঙের। চোখের মণি লালচে থেকে কমলা-বাদামি। পা, পায়ের পাতা ও নখ বাদামি। ঠোঁট কালচে-ধূসর। অপ্রাপ্তবয়স্কগুলো দেখতে প্রাপ্তবয়স্কদের মতোই, তবে ফ্যাকশে। মাথার চাঁদির পেছনটা ছিটবিহীন। চোখের মণি গাঢ় বাদামি।,

এরা মূলত সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনের বাসিন্দা। বনের গাছপালাসমৃদ্ধ এলাকা, ঝোপঝাড় ও বাঁশঝাড়, বিশেষ করে ছড়ার কাছাকাছি থাকে। উন্মুক্ত স্থানে পাওয়া মুশকিল। সচরাচর ঝোপঝাড় ও বাঁশঝাড়ে দল বেঁধে কীটপতঙ্গ, তাদের শূককীট, ফলমূল, ফুলের রস ও বীজ খুঁজে খায়। ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় মাটি থেকে পাঁচ ফুটের মতো ওপরে, পাহাড়ি ঢালের খোঁদলে, নিচু ঝোপঝাড় কিংবা বাঁশঝাড়ে কাপ বা বাটি আকারের গোলগাল বাসা বানায়। ঘিয়ে-সাদা রঙের তিন থেকে পাঁচটি ডিম পাড়ে; অনেক সময় ডিমে ছোট ছোট লালচে-বাদামি ছিট থাকে। ডিম ফুটে ছানা বের হয় প্রায় ১২ দিনে। ‘ছানারা দ্রুত বাড়ে। তবে কত দিনে ওড়ার পালক গজায় ও উড়তে শেখে, সে সম্পর্কে তথ্যের অপ্রতুলতা রয়েছে। প্রায় এক বছর বয়সে প্রজননক্ষম হয়। আয়ুষ্কাল ছয় থেকে আট বছর।,

লেখক: আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

 

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো 

এই পোস্টটি শেয়ার করুন
সবার আগে কমেন্ট করুন
কমেন্ট করতে ক্লিক করুন
comment url
গতকালের সেরা খবর
ফটোকার্ড প্রিভিউ
Rajdhala Photocard Preview
শিরোনাম...